জন্ম ও ধর্ম

শীতের রাত।মুদির দোকানদার জাপান বড়ুয়া দোকান বন্ধ করে বাড়ী ফিরছেন।বাজারের অন্যতম পরিচিত সওদাগর জাপান বড়ুয়ার দোকান থেকে বাড়ীর দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার।একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি পূর্ণ এই উত্তরনলবিলা গ্রামটিতে রয়েছে মুসলিম হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীতে বসবাস।সবার মাঝে রয়েছে একটি সাদৃশ্যপূর্ণ সম্পর্ক।দেখলে নির্ধারণ করা কঠিন।কে মুসলিম,কে হিন্দু,কে বৌদ্ধ।এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মাবলম্বীর লোকের সম্পর্কটা কয়েনের মতো।একদম আড়াআড়ী ভাব,এক অংশ বাদ দিলে অন্য অংশ কল্পনা করা দুষ্কর।জাপান বড়ুয়ার বাড়ী যেতে মধ্য রাস্তায় প্রথমে পড়ে চিতা।তারপরে শ্মশান।গভীর রাত সময় বারোটা ছুঁই ছুঁই।প্রতিদিন কোনো না কোনো পথচারীর সাথে তিনি রাতে বাড়ী ফিরেন।যদি কানো পথচারী  পাওয়া না যায়,তবে গাড়ীতে করে ফিরেন।গভীর রাতে এই দ্বীপাঞ্চলে গাড়ী চলাচল তেমন একটা হয়না।তার উপর আবার শীতের দাপট।দ্রুতগতিতে হাঁটছেন তিনি।চিতার কাছে এসে একটু ভয় লাগলো।তা পেরিয়ে চললেন ডানে বামে না তাকিয়ে।শ্মশান পেরিয়ে বাড়ীর কাছাকাছি মধ্য রাস্তায় হঠাৎ শিশুর কাঁন্নাস্বর শুনতে পেলেন তিনি।ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠলো পুরো শরীর।খুব খেয়াল করার চেষ্টা করলেন।এটি আসলে কোনো শিশুর কাঁন্নার শব্দ? নাকি ভূতপ্রেত তাঁকে তাড়া করছে।এসব ভাবতে ভাবতে আরো দ্রুতগতিতে হাঁটছেন তিনি।কিন্তু শব্দটা নবজাতক কোনো শিশুর শব্দ বলে মনে হচ্ছে।বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই তিনি ভয়ে দৌড় দিলেন।বাড়ীতে ঢুকে হাঁপাচ্ছেন।তাঁর মা এবং তাঁর স্ত্রী চমকে উঠলেন।জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন পুরো ঘটনা।জেঁগে থাকা পাশের বাড়ীর লোকজনও আসলেন।সবার কৌতূহল যেখানে জাপান সাহেব নবজাতক শিশুর কাঁন্নার শব্দ শুনেছেন,সেখানে যাওয়ার জন্য।কেউ টর্চলাইট নিলো,কেউ হারিকেন,কেউ বা দাঁ লাঠি নিয়ে যেতে লাগলো ঘটনাস্থলে।

ভয়ে ভয়ে কৌতূহলের সাথে সবাই এগোচ্ছে।
এই পৌষের শীতে জাপান সাহেব ঘেমে গেছেন।তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছেন এবং কৌতূহলীও বেশি তিনি।কেননা কাঁন্নার শব্দ তিনি স্পর্ষ্ট শুনতে পেয়েছেন।কাছাকাছি গেলেন সবাই।চুপচাপ এগোচ্ছেন।হ্যাঁ সত্যিই তো কোনো শিশু যেন কাঁদছে।একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন কৌতূহলী দৃষ্টিতে।সেখানে পৌঁছেই দেখেন সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতক শীতের তীব্রতায় কাঁতর।কে যেন এই নবজাতককে পেলে গেছেন।তাড়াতাড়ি জাপান ও তাঁর মা কাছে গেলেন।নবজাতক'কে খোলে নিলেন।প্রফুল্লিত হয়ে সবাই নবজাতক'কে নিয়ে বাড়ীতে ফিরে গেলেন।সে থেকে সন্তানহীন জাপান দম্পতির ঘরে আলোকিত করলো কুঁড়িয়ে পাওয়া ছেলেটি।

আট বছরে পাঁ দেওয়া ছেলেটি এখন মা'বাবার সাথে মন্দিরে যায়।সিদ্ধার্থের পুঁজো দেয়।ছেলেটি যার হোক না কেন,কিন্তু কোনো বড়ুয়ার নয়।যে গুটিকয়েক বড়ুয়া আছে এই নলবিলা গ্রামে সবার কাছে বিষয়টি এক অদ্ভুত গল্প।মুসলিম দম্পতির ঘরে জন্ম নিলে সে মসজিদে যাবে।বৌদ্ধ দম্পতির ঘরে জন্ম নিলে সে মন্দিরে যাবে।অথচ মুসলিম দম্পতির হলে তাঁর প্রার্থনার কথা ছিল মসজিদে।কিন্তু সে যায় মন্দিরে।জন্মটা বড় কথা নয়,বড় কথা হলো তাঁর পারপার্শিক পরিবেশ।একজন মানুষের, একজন সন্তানের মুসলিম কিংবা বৌদ্ধ।হিন্দু কিংবা খ্রিষ্টান হওয়ার চেয়ে মনুষ্যত্বময় মানুষ হওয়াটা জরুরী।তাই প্রত্যাশা করি জাপান দম্পতির কুঁড়িয়ে পাওয়া ছেলেটি মানুষ হোক।

Comments

  1. এই প্রখর ছাল ছেড়া রোদ্দে এমনটা হীম করা বাস্তব মানবিকতার গল্প যে আপনি অতটা শৈল্পিক ভাবে চিত্রায়িত করেছেন, মনে হচ্ছে ঐ শীতে আমিই হেটে যাচ্ছিলাম গল্পের নায়ক জাপান বড়ুয়ার ছায়া ধরে। আর ধর্মীয় প্রতিপালনের যে বিষয়টা বিশ্লেষণ করলেন তা গল্পের স্বার্থকতা শতাংশেই রক্ষিত হয়েছে। খুব চমৎকার লাগলো! শুভেচ্ছা শুভ কামনা!

    ReplyDelete
  2. আপনার লেখা দেখলেই না পড়ে যাওয়া সম্ভব না,,,প্রিয় আংকেল

    ReplyDelete
  3. ভাই আপনার লেখা পড়ে খুব ভালো লাগল।প্রতিটি চরণে ফোটে ওঠেছে বাস্তব চিত্র,মনে হচ্ছিল কোনো গল্পের বই পড়ছিলাম।

    একজন মানুষের, একজন সন্তানের মুসলিম কিংবা বৌদ্ধ।হিন্দু কিংবা খ্রিষ্টান হওয়ার চেয়ে মনুষ্যত্বময় মানুষ হওয়াটা জরুরী।
    শুভ কামনা রইল

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে সৎ ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বেশি

ফেইসবুক আইডি নিরাপদ রাখবেন কিভাবে

ধর্ম ও ধার্মিক