প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে সৎ ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বেশি

উত্তর নলবিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বটবৃক্ষ    
আজকাল স্কুলে স্কুলে বিস্কুট দেয়, মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের টাকা দেয় গাড়ীতে করে স্কুলে যাওয়ার জন্য হেঁটে গেলে ক্লান্ত হয়ে পরবে বলে।

আমাদের সময়ে স্কুলে বিস্কুট কিংবা গাড়ী ভাড়ার জন্য টাকা কোনোটাই ছিলো না। প্রায় কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতাম, সন্ধ্যায় বাড়ীর বাজার আনতে গিয়ে দু চার টাকা, এতে মহাখুশিতে আমরা বিশ্বজয় করে ফেলতাম।

তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি, আমাদের সময়ে পিইএসসি ছিলো না। বৃত্তি পরীক্ষা ছিলো মাথাব্যথার কারণ। মডেল টেষ্টের পর মডেল টেষ্ট। কোথাও ফটোকপির মেশিন ছিলো না স্কুল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের এক বাজার থেকে ফটোকপি করতে হত আমাদের।

আমান উল্লাহ স্যার আমাদের দুজনকে ফটোকপি করতে পাঠালেন। পঁচিশ টাকায় পঞ্চাশ কপি। টাকা দিলেন এক'শ। আমি আর মোরশেদ মিলে বৈশাখের রৌদ্র খরতাপে হেঁটে হেঁটে ফটোকপি করতে গেলাম। তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে ফটোকপি সম্পন্ন করে হেঁটে হেঁটে আসছি। রাস্তায় ফেটি বক্স আইসক্রিম বিক্রি করছে। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেলেও ঐ পঞ্চাশ টাকা থেকে আইসক্রিম খাওয়ার সাহস হয়নি আমাদের।

আজকাল যে স্কুলে বিস্কুট দেওয়া হয় সে বিস্কুট দেওয়ার সময় শিক্ষকদের কত মাথাব্যথা। হাতে হাতে বিস্কুট দিতে হয়, কেউ বিস্কুটের প্যাকেট দুইটা কিংবা তার অধিক নিয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখতে হয়। কেউ বা বিতরণের সময় দুইটা কিংবা তিনটা প্যাকেট নিয়ে নেয় বলে। কোনো  শিক্ষার্থীকে যদি শিক্ষকের সন্দেহ হয় কোনো শিক্ষার্থী প্যাকেট বেশি নিয়েছে এমন, তখন কেউ বিস্কুটের প্যাকেট বেশি নিয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলেই সজোরে বলে "না...!"
অনেক সময় খতিয়ে দেখতে গেলেই একের অধিক প্যাকেট পাওয়া যায় অনেকের কাছে। এটা তো চরম অসততা।

পাঠদান দিয়ে নৈতিকতা আর সততা শেখাতে না পারলে সে শিক্ষার মূল্য কোথায়? জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বেশি। শিক্ষার প্রাথমিক জীবনে শিক্ষার্থী অসৎ হলে আপনি কখনো শিক্ষাগুরু হতে পারবেন না।

এই যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিনামূল্যে বিস্কুট দেওয়া হয় এটা কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাঝে সততার বীজ বপন করার গুরুত্বপূর্ণ  মাধ্যম। যা শিক্ষকরা কাজে লাগাতে পারেন। আমার গ্রামে উত্তর নলবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাস্টার মীর হোসেন স্যার সেটাই করে থাকেন। বিস্কুটের কার্টন ক্লাসের সম্মুখে রাখেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিজনে একটি করে প্যাকেট নিয়ে চলে যায়। কেউ প্যাকেট বেশি নিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার কেউ নেই। শিক্ষার্থীরা যে একটা করে প্যাকেট নিচ্ছে এটাই সততা। এটা দেখে আমি গর্বিত হয়েছি, আপ্লুত হয়েছি অনেক।  কেননা এই প্রতিষ্ঠানেই আমার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি।যোগ্যতা কখনো সার্টিফিকেটে হয়না, যোগ্যতা হয় তাঁর কর্মে।

মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা আজকাল টাকা ছাড়া স্কুলে যেতে চায় না, গাড়ী ভাড়া তো অবশ্যই দিতেই হয়। দেখেছি এই টাকা জমা করে অনেকে স্মার্ট ফোন কিনেছে। ফোন নিয়ে সারা দিন গেইম খেলছে। মোবাইল ব্যবহারের নির্ধারিত বয়স রয়েছে। আমরা অভিভাবকরা সন্তানকে বেশি কিছু শেখাতে গিয়ে তাঁর আগামীতে শেখার রাস্তাকে বন্ধ করে দিচ্ছি না'তো? আবার অনেকে সে টাকায় অনেক কিছুই করে। টাকা খরচা করে সন্তানকে শিক্ষিত করা যায়, কিন্তু "মানুষ" করতে গেলে সন্তানকে ত্যাগের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে দিন, তবে-ই সে মানুষ হবে। ত্যাগ ছাড়া শিক্ষা গাছ ছাড়া ফলের মালিক হওয়ার মতো।

লিখেছেন 
কাব্য সৌরভ

Comments

Popular posts from this blog

ফেইসবুক আইডি নিরাপদ রাখবেন কিভাবে

ধর্ম ও ধার্মিক